শব্দ এবং বধিরতা

Spread the love

Md. Najmul Islam

আমরা একটি শব্দময় পৃথিবীতে বাস করি। শহুরে জীবনের গাড়ির শব্দ, গ্রামীন জীবনের পাখির কলকাকলি, সমুদ্রের গর্জন- এরকম প্রকৃতির নানা শব্দের সাথে আমরা সবাই পরিচিত। একে অন্যের সাথে যোগাযোগের ক্ষেত্রেও শব্দের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি। আমরা কথা বলার সময় অর্থবোধক শব্দ উৎপন্ন করি এবং অপরজন সেই শব্দের মাধ্যমে তার ভাব বুঝতে পারে। কিন্তু আমরা কি একটি পৃথিবী কল্পনা করতে পারি, যেখানে কোন শব্দ নেই অথবা চারদিকে শব্দ হচ্ছে কিন্তু আপনি শুনতে পাচ্ছেন না?  আমরা যারা সুস্থ স্বাভাবিকভাবে শুনতে পাই, তাদের জন্যে এমনটা কল্পনা করাটাও অনেক কঠিন।

 কিন্তু ২০১৩ সালের এক সমীক্ষা অনুযায়ী বধিরতা প্রাদুর্ভাবের হার ৯.৬%, অর্থাৎ তখনকার তিন ভাগের এক ভাগ জনগন কোন না মাত্রার বধিরতার শিকার। এর মাঝে ১.২% মানুষ আছে পূর্ন বধির, অর্থাৎ তখনকার জনসংখ্যার ভিত্তিতে প্রায় ২০ লাখ মানুষ যারা কোনো রকম শব্দ শুনতে পান না। আজ সংখ্যাটি আরো বেশি।

Cartoon-Repeat-Everything-Twice

বধিরতা বাইরের থেকে দেখা যায় না ; একমাত্র অনুধাবন করা যায় যখন তা তীব্র আকার ধারন করে। কিন্তু আবার একই সাথে যখন বধিরতার পুর্ণাংগ প্রকাশ পায় তখন বধিরতায় আক্রান্ত ব্যাক্তির অথবা তার পরিবারের তার এই দুর্বলতা গোপন করার একটা প্রবনতা থাকে। আবার এই একই কারনে বধির মানুষজন হিয়ারিং এইড পড়তে চায় না, আর পরলেও তা অত্যন্ত গোপনীয়তা রক্ষা করার চেষ্টা করে। অশিক্ষা, অসচেতনতা, সামাজিক রীতিনীতি ও বিভিন্ন কুসংস্কারের কারনে বধিরতার বিষয়টি আজও অবহেলিত। চশমা পড়ার সময় কিন্তু আমাদের এই ধরনের লজ্জা বা সংকোচ বোধ হয় না।

শ্রবণ অনুভুতি বা হিয়ারিং সেন্স কি?

শ্রবন অনুভুতি আমাদের পাঁচটি অনুভুতির  একটি। আমরা যেমন চোখ দিয়ে দেখি, নাক দিয়ে ঘ্রাণ নেই, জিহ্বা দিয়ে স্বাদ নেওয়ার মাধ্যমে প্রকৃতির অনুভুতি নিতে পারি, ঠিক তেমনি ভাবে কান দিয়ে শব্দ শুনে আমরা প্রকৃতির সাথে যুক্ত হই, একে অপরের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করি, নিজের মনোভাব প্রকাশ করি এবং শিক্ষা অর্জন করি। চোখ দিয়ে না দেখে শুধু কানে শুনেও আমরা শব্দের সাথে পরিচিতি লাভের মাধ্যমে যোগাযোগ স্থাপন পারি। উদাহরণস্বরূপ দরজায় কেউ কলিং বেল বাজালে, আমরা কাউকে না দেখেও বুঝতে পারি যে বাইরে কেউ এসেছে। অথবা কারো ডাক শুনেই বুঝা যায় যে কে ডাকছে যদি সে দৃষ্টিসীমার মাঝে না ও থাকে।

আমরা কিভাবে শুনি?

সমগ্র কানকে মুলত তিনভাগে ভাগ করা হয়েছেঃ Inner ear (অন্তঃকর্ণ), middle ear (মধ্য কর্ন), outer ear (বহিঃকর্ণ)। Outer ear বা বহিঃকর্ণ অংশটুকুই মুলত দেখা যায়। মাথার দুই পাশে যে বর্ধিত অংশ, সেটিই outer ear । এর কাজ হচ্ছে প্রকৃতি থেকে শব্দ সংগ্রহ করা এবং তা কানের পর্দা পর্যন্ত পৌছে দেয়া। Middle ear এ আছে কানের পর্দা যা বাহির থেকে লাইটের আলোতে দেখা যায় কিন্তু স্পষ্ট বোঝা যায় না। পর্দার সাথে যুক্ত আছে ওসিকুলার চেইন (ossicular chain) যেটি ম্যালিয়াস(malleus), ইনকাস (incus) ও স্টেপিস (stapes) নামে তিনটি ক্ষুদ্র হাড় দিয়ে তৈরি যা inner ear এর কক্লিয়ারের সাথে যুক্ত থাকে। এই চেইন একটি ব্রীজের মত কাজ করে। কানের পর্দায় যখন শব্দ আঘাত করে তা পর্দার পিছনে থাকা ওসিকুলার চেইনকে কম্পিত করে এবং এই কম্পন inner ear এর কক্লিয়ার পর্যন্ত পৌছায়। কক্লিয়া একটি শামুকের ন্যায় প্যাঁচানো অঙ্গ। শব্দের কম্পন সেখানে গিয়ে মাধ্যমে কক্লিয়ারের মধ্যে থাকা হিয়ারিং সেলকে বা কোষগুলিকে আন্দোলিত বা কম্পিত করে। আমাদের এই হিয়ারিং সেল বা  শ্রবণের স্নায়ুগুলো এই কম্পনকে একটি বৈদ্যুতিক সিগন্যালে পরিবর্তিত করে শব্দকে মস্তিষ্কে পৌঁছায়। এর পরেই আমরা সেই শব্দকে শুনতে পাই এবং অনুধাবন করি। বিষয়টি আরো ভালোভাবে বুঝতে নিচের ইউটিউব ভিডিওটি  দেখতে পারেনঃ

একজন ব্যক্তি তার জীবদ্দশার বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কারণে বধিরতার সম্মুখীন হতে পারেন। জীবনের যে সময়গুলো সবচেয়ে বেশী সংবেদনশীল তার উপর ভিত্তি করে আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) তথ্য অনুযায়ী নিন্মোক্ত বধিরতার কারনগুলো নিচে দেয়া হলোঃ

# জন্মপূর্ব সময় (গর্ভাবস্থায়)-
• জেনেটিক কারন যার মধ্যে বংশানুক্রমে বধিরতা
• অন্তঃ সত্ত্বা কালীন সময়ে সংক্রমণ, যেমনঃ রুবেলা ভাইরাস এবং সাইটোমেগালো ভাইরাস (CMV)

# জন্মকালীন সময়-
•অক্সিজেনের অভাব
• অস্বাভাবিক জন্মকালীন জন্ডিস
• জন্মের সময় ওজন কম থাকা
• অন্যান্য জন্মকালীন অসুস্থতা

# শৈশব ও কৈশোর বয়স-
• দীর্ঘস্থায়ী কানের সংক্রমন (chronic suppurative otitis media or CSOM)
• কানে দীর্ঘদিন ধরে পানি জমে থাকা
• মেনিনজাইটিস (meningitis) ও অন্যান্য সংক্রমণ

# প্রাপ্তবয়ষ্ক ও বৃদ্ধ বয়স-
• দীর্ঘস্থায়ী রোগ (chronic diseases)
• ধূমপান
• অটোস্ক্লেরোসিস (Otosclerosis)
• বার্ধক্য জনিত
• আকস্মিক বধিরতা

# সামগ্রিক জীবদ্দশায়-

• দীর্ঘ সময়কালের কানে ময়লা
• কানে অথবা মাথায় আঘাত
• উচ্চ শব্দ
• অটোটক্সিক মেডিসিন
• রাসায়নিক জায়গায় কাজ যা শ্রবনের জন্য ক্ষতিকারক
• পুষ্টিহীনতা
• ভাইরাল ইনফেকশন
• জেনেটিক হেয়ারিং লস



প্রতিকার

প্রায় সকল কারন গুলো প্রতিকার করা সম্ভব শুধুমাত্র সচেতনতা, সঠিক সময় ডাক্তারের পরামর্শ ও সঠিক পদক্ষেপ গ্রহন করার মাধ্যমে। শৈশবকালীন বধিরতা ৬০% প্রতিরোধ করা সম্ভব শুধু জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার বাস্তবায়নের মাধ্যমে। তারপরেও জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে বধিরতাকে এড়ানোর জন্য কিছু কার্যকরী কৌশলের মধ্যে রয়েছেঃ
সময়মত টিকাদান
১। ভালো মাতৃকালীন এবং শিশু সেবার অনুশীলন
২। জেনেটিক কাউন্সিলিং
৩। উচ্চ শব্দ এবং রাসায়নিক প্রভাব থেকে হিয়ারিং সংরক্ষনের জন্য প্রফেশনালের (Certified ENT Doctor, Audiologist) শরণাপন্ন হওয়া।
৪। নিরাপদ শ্রবণের কৌশল অবলম্বন করা।
৫। অযাচিত ঔষুধ গ্রহন থেকে বিরত হওয়া।

তথ্যসুত্রঃ

  1. Deafness and hearing loss; Deafness and hearing loss (who.int)
  2. National survey on prevalence of hearing impairment in Bangladesh 2013; https://www.researchgate.net/publication/274619240
  3. Prevention of Deafness in Bangladesh; https://www.researchgate.net/publication/347590436

লেখক:

মোঃ নাজমুল ইসলাম
ক্লিনিক্যাল স্পিচ অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপিস্ট
ফেইথ বাংলাদেশ
২/৪ খ, ব্লক- সি, লালমাটিয়া, ঢাকা- ১২০৫
হটলাইন: +৮৮০১৭৮৩২৪৮৪২৩
ওয়েবসাইট:  www.faithbangladesh.org/services

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Skip to content