“তোমার হাসিটা হোক অমলিন “

Spread the love

 

ডা. তানজিলা বুশরা

বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্য নিয়মিত দাঁতের পরীক্ষার গুরুত্ব

তারা একটু আলাদা—
একটু বেশি অনুভূতিপ্রবণ, একটু বেশি নির্ভরশীল, একটু বেশি ভালোবাসার দাবিদার।
তারা বলতে পারে না, কিন্তু বুঝতে পারে।
তারা হাঁসতে চায়, খেলতে চায়, স্বপ্ন দেখতে চায়—
ঠিক আমাদের মতোই।

তবে এই শিশুদের দাঁতের সামান্য একটু  ব্যথা অনেক বড় এক যন্ত্রণায় পরিণত হতে পারে।
তারা বলতে পারে না, কিন্তু প্রতিটি অশান্ত আচরণ, প্রতিটি কান্না — হয়তো কোন না বলা ব্যথার ভাষা।

 বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য এবং তাদের ডেন্টাল সমস্যার ঝুঁকি

 ১. অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার (ASD):

  • সংবেদনশীলতা বেশি – ব্রাশ বা পানি মুখে দিলে অস্বস্তি বোধ করে।
  • মৌখিক যত্ন নিতে না চাওয়ার প্রবণতা।
  • মুখে কিছু রাখার অভ্যাস (oral fixation), যা দাঁতের ক্ষয় বাড়ায়।

 ২. বুদ্ধিপ্রতিবন্ধিতা (Intellectual Disability):

  • দাঁতের ব্যথা বোঝাতে পারে না।
  • নিয়ম মেনে ব্রাশ করা বা কুলি করা শেখাতে সময় লাগে।
  • মিষ্টিজাতীয় খাবারের প্রতি বেশি আকর্ষণ, যা দাঁতের ক্ষয়ের কারণ।

 ৩. সেরেব্রাল পালসি (Cerebral Palsy):

  • হাত ও মুখের চলাচলে সীমাবদ্ধতা থাকার কারণে দাঁতের পরিচর্যা কঠিন।
  • পেশির অনিয়মিত চাপের কারণে দাঁতের ভাঙন বা ক্ষয়।

 ৪. ডাউন সিনড্রোম (Down Syndrome):

  • ছোট ও ভিড়ানো দাঁত, মাড়ির দুর্বলতা — সহজেই ইনফেকশন হয়।
  • মুখ খোলা রেখে শ্বাস নেওয়ার অভ্যাস, মুখ শুকিয়ে যায় — দাঁতের ক্ষয় ত্বরান্বিত হয়।

 তারা যখন দাঁতের ব্যথায় কাঁদে, তখন হয়তো আপনি ভাবছেন — ওর মুড ভালো নেই!

কিন্তু যদি ভেতরে ভেতরে একটি দাঁত পঁচে যাচ্ছে?
যদি সে দিনের পর দিন দাঁতের ব্যথা নিয়ে রাত জেগে থাকে — আর বলতে না পারে?
যদি সে শুধু খাওয়া বন্ধ করে দেয়, চুপচাপ হয়ে যায় — আপনি কি বুঝতে পারবেন?

এই ব্যথাগুলো শুধু দাঁতে সীমাবদ্ধ থাকে না।
এগুলো ওদের ঘুম কেড়ে নেয়, খাওয়া থেকে বিরত রাখে,
থেরাপিতে মনোযোগে বাধা দেয়, এবং সবচেয়ে বড় কথা — তাদের মিষ্টি হাসিটা মুছে দেয়।

দাঁতের সমস্যা কীভাবে শিশুর জীবন দুর্বিষহ করে তোলে?

১. অব্যক্ত ব্যথা অস্বস্তি:

বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুরা অনেক সময় ব্যথা, অস্বস্তি বা অস্বাভাবিক অবস্থার কথা প্রকাশ করতে পারে না। দাঁতের পোকা, ক্যাভিটি, গাম ইনফেকশন বা দাঁতের ভাঙনজনিত ব্যথা দিনের পর দিন তারা সহ্য করে, কিন্তু সেটি বুঝে ওঠা অভিভাবকদের পক্ষে কঠিন হয়। ফলে তারা আচরণগত পরিবর্তন (যেমন: অতিরিক্ত চিৎকার, ঘুমের সমস্যা, খাবার খেতে অনীহা) দেখাতে শুরু করে, যা আসলে দাঁতের সমস্যারই বহিঃপ্রকাশ।

২. খাবার গ্রহণে সমস্যা পুষ্টিহীনতা:

দাঁতে ব্যথা বা মাড়ির ইনফেকশনের কারণে শিশু শক্ত খাবার খেতে পারে না। তারা হয় খাওয়া কমিয়ে দেয়, নয়তো শুধুমাত্র মিষ্টি বা সফট খাবার খায় যা আরও দাঁতের ক্ষতি করে। এর ফলে পুষ্টির ঘাটতি দেখা দেয় এবং শিশুর বৃদ্ধি ও বিকাশ ব্যাহত হয়।

৩. মুখগহ্বরের গন্ধ সামাজিক বিচ্ছিন্নতা:

দীর্ঘদিন দাঁতের যত্ন না নিলে মুখে দুর্গন্ধ তৈরি হয়, যা শিশুদের স্কুল বা থেরাপি সেশনে আত্মবিশ্বাস হারাতে বাধ্য করে। অনেক সময় সহপাঠীরা এ নিয়ে হাসাহাসি করলে তারা আরও সামাজিকভাবে পিছিয়ে পড়ে।

৪. ভাষা বিকাশে বাধা:

মুখের স্বাস্থ্য খারাপ থাকলে শিশুরা চবাই, শব্দ উচ্চারণ এবং ভাষা চর্চায় পিছিয়ে পড়ে। অনেক শিশু তোতলামি, জিভে কষ্ট, অথবা অনিচ্ছাকৃত মুখের গতির সমস্যায় ভুগতে পারে, যা ভাষা ও কথাবার্তার দক্ষতা অর্জনে বাধা দেয়।

৫. থেরাপি পড়াশোনায় মনোযোগের ঘাটতি:

নিরব ব্যথা বা দাঁতের অসুস্থতা শিশুকে অস্থির, মনোযোগহীন এবং ক্লান্ত করে তোলে। থেরাপিস্ট বা শিক্ষকরা অনেক সময় এর আসল কারণ না বুঝে শিশুদের আচরণগত সমস্যা ধরে নিয়ে ভুল মূল্যায়ন করেন।

বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্য নিয়মিত দাঁতের পরীক্ষার গুরুত্ব: অভিভাবকদের জন্য একটি সচেতনতার বার্তা

বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের যত্ন একটি পূর্ণকালীন দায়িত্ব। এই শিশুদের মানসিক, শারীরিক কিংবা নিউরোডেভেলপমেন্টাল চ্যালেঞ্জ থাকায় তাদের মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করাই অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। এরই মধ্যে অন্যতম উপেক্ষিত ও গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো — মৌখিক স্বাস্থ্য বা দাঁতের যত্ন। অনেক অভিভাবকই ভাবেন দাঁতের সমস্যা ছোটখাটো বিষয়, কিন্তু বাস্তবে এটি শিশুর সার্বিক সুস্থতা, খাদ্যাভ্যাস, ঘুম, আচরণ, ভাষা বিকাশ এবং আত্মবিশ্বাসের উপর গভীর প্রভাব ফেলে।

 অভিভাবক হিসেবে আপনি কীভাবে পাশে থাকতে পারেন?

 ১. প্রতি মাস অন্তর দাঁতের চেকআপ করান:

বিশেষজ্ঞ পেডিয়াট্রিক ডেন্টিস্টের কাছে শিশুকে নিয়ে যান। নিয়মিত পর্যবেক্ষণ দাঁতের সমস্যা শুরুর আগেই প্রতিরোধ করে।

 ২. দাঁতের যত্নকে ভালোবাসার অংশ করুন:

দাঁত ব্রাশ করা যেন শিশুদের জন্য ভয় নয়, বরং আনন্দ হয় — তার জন্য রঙিন ব্রাশ, গানের মাধ্যমে রুটিন, মডেলিং ইত্যাদি ব্যবহার করুন।

৩. ডেন্টিস্টের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করুন:

শিশুদের অনেক সময় দন্তচিকিৎসকের চেয়ারে বসতে ভয় লাগে। তাই তাদের জন্য ফ্রেন্ডলি এনভায়রনমেন্ট, ধৈর্যশীল পেডিয়াট্রিক ডেন্টিস্ট এবং পরিচিত মুখ (অভিভাবক) সঙ্গে থাকাটা জরুরি।

৪. অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিন:

faith Bangladesh Dental Unit-এর মত শিশু-বান্ধব ডেন্টাল ইউনিটগুলোতে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুর প্রতি সহানুভূতিশীল চিকিৎসক ও সহকারী থাকে যারা ধৈর্য ও ভালোবাসা দিয়ে সেবা দেয়।

৫. দাঁতের যত্নকে থেরাপি বা রুটিনের অংশ বানান:

যেভাবে থেরাপি, স্কুল বা ওষুধ খাওয়ার রুটিন আছে, ঠিক তেমন দাঁতের যত্নও একটি রুটিন করে ফেলুন। দিনে দুইবার ব্রাশ করা, চিনি জাতীয় খাবারের পর কুলি করানো, এবং নির্দিষ্ট দিনে ডেন্টাল চেকআপে নিয়ে যাওয়া অভ্যাস করুন।

 ৬. শিশুদের ব্যথার ভাষা বুঝতে শিখুন:

তাদের হঠাৎ রেগে যাওয়া, অস্থিরতা, মুখে হাত দেওয়া, খাওয়া বন্ধ করে দেওয়া — হতে পারে দাঁতের সমস্যার ইঙ্গিত। সচেতন থাকুন।

বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জীবনে দাঁতের ছোট একটি সমস্যাও বড় একটা মানসিক, সামাজিক এবং আচরণগত চ্যালেঞ্জে পরিণত হতে পারে। দাঁতের যত্ন শুধু স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য নয়, বরং এটি শিশুর ব্যক্তিত্ব বিকাশ, শিক্ষা গ্রহণ, সামাজিক মেলামেশা এবং আনন্দময় জীবনের পূর্বশর্ত।

আপনি অভিভাবক হিসেবে দাঁতের যত্নকে অগ্রাধিকার দিলে, আপনার শিশুটির জীবন সহজ, স্বাভাবিক এবং সুন্দর হতে পারে।

 আমরা চাই প্রতিটি শিশু্র জীবন হাসিতে পরিপূর্ণ থাকুক।

বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুরা আমাদের সমাজের আলো।
তাদের স্বাস্থ্যের প্রতিটি দিকেই সমান মনোযোগ প্রয়োজন।
আর মুখের হাসি যেন অন্ধকারে হারিয়ে না যায় — সেই দায়িত্ব আমাদের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Skip to content